গদ্য

শব্দযাত্রার পথিক মামুন রশীদ

কাব্যকলি
  • ০৮-১২-২০২৫

শব্দযাত্রার পথিক মামুন রশীদ

মামুন রশীদ তিনটি ছোটকাগজ সম্পাদনা করে- নক্ষত্র, দ্বিবাচ্য, সংক্রান্তি। ছোটকাগজ বলতে যারা কেবল পাতার গন্ধ বোঝেন, তারা জানেন এসব কতটা শ্রমসাধ্য। একেকটি সংখ্যা যেন অদৃশ্য মানুষের হাতছানির মতো, আধুনিক ও প্রাচীন সাহিত্যের মাঝখানে দাঁড়িয়ে নতুন পথের অনুসন্ধান। মামুন রশীদ সেসব পথের এক আগ্রহী পথিক। মাঝে মাঝে মনে হয়, সে শব্দ দিয়ে নিজের জন্য আরেকটা স্থায়ী ঠিকানা বানিয়ে ফেলেছে, যা ঢাকার ভিড়েও হারায় না।

 নাহিদ হাসান রবিন


দেখার আগেই যার সম্পর্কে শুনে ফেলা যায়, তাকে চেনা হয় শব্দের ভেতর দিয়ে, তা কাগজের হোক, বা মানুষের মুখে ভাসমান দৈনন্দিন গল্পে। মামুন রশীদের সাথে আমার পরিচয়টা তেমনই। বগুড়ার আকাশের নিচে আমাদের দু-জনেরই শৈশব-তারুণ্যের ধূলো জমে আছে, অথচ দেখা হয়নি বহুদিন। একই জেলার মানুষ, একই নদীর ঘোলা জলে হাত ধোয়া কোনো এক বিকেল হয়তো দুজনের জীবনেই ঘটেছে, কিন্তু সেই বিকেল আমাদের একসাথে মেলেনি। বগুড়া বড় শহর নয়, তবু মানুষকে মাঝে মাঝে হারিয়ে দেয়, দূরে সরিয়ে রাখে, পরে আবার হঠাৎ টেনে আনে খুব কাছেও।

ঢাকা শহর মানুষকে বদলায়, অন্তত দূরের মানুষকে। কিন্তু মামুন রশীদকে বদলাতে পারেনি। নব্বই দশক থেকে লেখা শুরু করা এই মানুষটির মধ্যে এখনো একই ধৈর্য, একই নম্রতা, একইভাবে শব্দের কাছে আত্মসমর্পণ। কবিতা তার প্রথম ঘর, এটা সবাই জানি। কিন্তু গদ্যের সঙ্গে তার সম্পর্কটা এক ধরনের আলো-অন্ধকারের খেলা। কখনো খোলামেলা, কখনো সুরক্ষিত। গদ্য-পদ্য মিলে তার বইয়ের সংখ্যা তিরিশ ছুঁয়েছে, আর এই তিরিশ সংখ্যা শুধু কর্মদক্ষতার পরিচয় নয়, এটা তার নিঃশ্বাস নেওয়ার আরেক রকম পদ্ধতি। কেউ যেমন হাঁটেন, কেউ দৌড়ান, কেউ বা ভাবনার ভিতর নিজেকে হারান, মামুন রশীদ লেখেন। আর এই লেখা তাকে বারবার নির্মাণ করেছে, বদলেছে, আবার নতুন এক পথে নিয়ে গেছে।

মামুন রশীদ তিনটি ছোটকাগজ সম্পাদনা করে- নক্ষত্র, দ্বিবাচ্য, সংক্রান্তি। ছোটকাগজ বলতে যারা কেবল পাতার গন্ধ বোঝেন, তারা জানেন এসব কতটা শ্রমসাধ্য। একেকটি সংখ্যা যেন অদৃশ্য মানুষের হাতছানির মতো, আধুনিক ও প্রাচীন সাহিত্যের মাঝখানে দাঁড়িয়ে নতুন পথের অনুসন্ধান। মামুন রশীদ সেসব পথের এক আগ্রহী পথিক। মাঝে মাঝে মনে হয়, সে শব্দ দিয়ে নিজের জন্য আরেকটা স্থায়ী ঠিকানা বানিয়ে ফেলেছে, যা ঢাকার ভিড়েও হারায় না।

আমাদের পরিচয় ২০১৫ সাল। বছরটি আমার মনে আছে, কারণ মানুষের জীবনে এমন কিছু সম্পর্ক আসে যেগুলোকে তারিখ দিয়ে আলাদা করে রাখা যায়। সে বছরই প্রথম দেখা, প্রথম আলাপ, প্রথমবার উপলব্ধি। এই মানুষটি আমার কাছাকাছি বয়সের হলেও তার ভেতরের বয়স আলাদা। শব্দের মানুষদের এমনটাই হয়। পরিচয়ের শুরুতেই আমরা বন্ধু হয়ে গেলাম। এর পেছনে তেমন কোনো নাটকীয়তা ছিল না, বরং ছিল এক ধরনের স্বাভাবিক প্রবাহ। যেমন নদী একসময় গিয়ে মিলেই যায় আরেক নদীতে। বগুড়া আমাদের শিকড়, আর লেখালেখি আমাদের দুজনেরই নেশা। ফলে সম্পর্ক গড়ে উঠল কথার জোরে, ভাবনার মিলেই।

সময় অসময়ে কথা হয়। কখনো লেখা নিয়ে, কখনো জীবনের ব্যস্ততা নিয়ে, কখনো অদ্ভুত এক নির্জনতা নিয়ে। লেখালেখি মানুষকে আলাদা করে দেয় পৃথিবীর ভিড় থেকে, কিন্তু সেই আলাদা থাকার মধ্যে কেউ একজন যদি সঙ্গী হয়ে আসে তাহলে তা আশীর্বাদ। মামুন রশীদ আমার জন্য তেমনই একজন মানুষ।
তিনি শুধু লেখক নন, সাংবাদিকও। পেশাগত কঠোরতা আর সৃজনশীল নরমতার দ্ব›দ্ব তার ভেতরে সুন্দরভাবে সহাবস্থান করে। দিনের আলোয় সে খবরের মানুষ। রাতের নরম আলোয় সে কবি। তার কথার ভেতর এই দুই সত্তা কখনোই মারামারি করে না। বরং একে অন্যকে জায়গা দিয়ে সামঞ্জস্য রাখে।

যে কেউ তাকে দেখলেই বুঝবেন, এমন মানুষকে বন্ধুর আসনে বসাতে দ্বিধা লাগে না। তিনি নম্র, ভদ্র, বিনয়ী যে বিনয় মানুষের মুখে বলা যায় না, শুধু আচরণে বোঝা যায়। কথাবার্তা নরম, হাসি সংযত, আর আচরণে এক অদৃশ্য মর্যাদা।

লেখকদের দেখা যায় কখনো কখনো নিজেদের শব্দে ডুবে যেতে, নিজেদের নিয়ে ভাবতে, নিজেদের কেন্দ্র করে পৃথিবী সাজাতে। কিন্তু মামুন রশীদ এরকম নন। সে নিজের চেয়ে অন্যকে বড় ভাবে। মানুষের গল্প শোনে, মানুষের সুখ-দুঃখকে গুরুত্ব দেয়। এই কারণেই হয়তো পাঠকের সাথে তার সম্পর্ক আলাদা। পাঠক তার লেখা পড়ে শুধু কাহিনী পান না, পান মানুষের স্পর্শও।

আমি তার থেকে বয়সে সামান্য বড়। তবে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বয়স কোনোদিনই বাধা হয়নি। মজার বিষয় হলো খ্রিস্টাব্দ ভিন্ন হলেও, আমাদের জন্ম তারিখ কিন্তু এক। ২ আগস্ট আমাদের দুজনেরই জন্মদিন। সমমনা হওয়ার কারণে আমাদের সম্পর্ক আরও সহজে পোক্ত হয়েছে। মতের মিল, চিন্তার মিল, কিংবা অন্তর্গত সেই রহস্যময় নীরবতা যা দুজন মানুষকে কাছাকাছি টেনে আনে এসব মিলেই আজ আমাদের বন্ধুত্ব স্থায়ী।

২০১৫ থেকে আজ পর্যন্ত আমাদের সম্পর্কের কোথাও কোনো ঘাটতি নেই। একসময় ভেবেছিলাম, হয়তো পরিচয়ের প্রথম দিকের উচ্ছ্বাস  প্রভাব ফেলছে, পরে হয়তো কমে যাবে। কিন্তু তা হয়নি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়েছে। হয়তো তাই ঢাকা বা বগুড়া যেখানেই থাকি, অনুভূতির দূরত্ব কখনো বাড়ে না।

মাঝে মাঝে মনে হয় মামুন রশীদের ভিতরে যে লেখকের জন্ম হয়েছিল নব্বই দশকে, আজ সে সেই লেখকত্বকে ছাড়িয়ে গেছে। তার লেখার পরিধি বাড়ছে, ভাবনার বিস্তারও। শব্দের দুনিয়ায় সে ক্রমেই নিজের জায়গাটা দৃঢ় করছে। যে বয়সে অনেকে দিশা হারায়, মামুন সেই বয়সেই নিজের আলো জ্বালিয়ে দিয়েছে।

ভবিষ্যতের দিকে তাকালে মনে হয় বাংলা সাহিত্যের দৃশ্যপট যেভাবে বদলে যাচ্ছে, সেখানে তার অবস্থান আরও উঁচু হবে। লেখার যে ধারাবাহিকতা সে বজায় রেখেছে, যে শ্রম প্রতিদিনের ভেতর দিয়ে বুনে চলেছে তা বৃথা যাবে না। একদিন সে বাংলা সাহিত্যের উল্লেখযোগ্য লেখকদের সারিতে স্থায়ী আসন পেয়ে যাবে, এটা ভাবা অবাস্তব নয় বরং স্বাভাবিক।

বন্ধুত্বের দিক থেকে আমি শুধু তাকে নয়, তার সম্ভাবনাকেও কাছ থেকে দেখি। অনেক সময় তার কোনো লেখা পড়ে মনে হয়, এই মানুষটির আসল পথচলা এখনো শুরুই হয়নি, সামনে তার জন্য অপেক্ষা করে আছে আরও উজ্জ্বল সময়। হয়তো দশ বছর, হয়তো বিশ বছর পর আমরা তার নাম উচ্চারণ করব অন্য এক উচ্চতায় দাঁড়িয়ে। আর তখন মনে পড়বে যে মানুষটিকে আমরা খুব সহজভাবে চিনি বলে ভাবি, সে আসলে শব্দের ভেতরে জন্ম নেওয়া এক বিস্ময়। এই বিস্ময়ের সঙ্গী হতে পারা- এটাই আমার আনন্দ, আমার গর্ব। কারণ এমন মানুষ খুব কমই আসে, যারা কথায় নয়, আচরণে, চিন্তায়, সৃষ্টিতে নিজেকে ধীরে ধীরে নির্মাণ করে একটি বৃহৎ ভ‚মির মতো। মামুন রশীদ তেমনই একজন। আর আমি জানি তার অগ্রযাত্রা এখনো অনেক বাকী। শব্দের নরম আলোয় সে যে পথ খুঁজে পেয়েছে, সেই পথ একদিন তাকে নিয়ে যাবে নতুন এক দিগন্তে, যেখানে বাংলা সাহিত্য তার নাম উচ্চারণ করবে সম্মান ও স্বীকৃতির সঙ্গে। ততদিন আমরা পাশে থাকব বন্ধুত্বের নিশ্চুপ  আলোর মতো।

শেয়ার করুন:
কাব্যকলি

শব্দের ক্যানভাসে আঁকি অনন্তের ছবি...